বিবিধ

কোরবানি করা কাদের উপর ওয়াজিব – জেনে নিন

কোরবানির ঈদ আসলেই আমাদের অনেকের জিজ্ঞাসা থাকে কাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব আবার কারা কুরবানীর না দিলেও চলবে। আমাদের এই পোষ্টের মাধ্যমে আপনারা কুরবানী সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবেন এবং কুরবানীর ওয়াজিব ওয়ালা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন। কোরবানি অর্থ হল কাছে যাওয়া, নৈকট্য অর্জন করা, ত্যাগ স্বীকার করা বা বিসর্জন দেওয়া। ইসলামী পরিভাষায় কুরবানী হলো “জিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখ থেকে ১২ তারিখ সূর্য অস্ত  পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে, শরীয়তের বিধান অনুসারে নির্দিষ্ট পশু জবাই করা”। একটি কুরবানী হলো – একটি ছাগল, একটি ভেড়া বা একটি দুম্বা  এবং গরু, মহিষ ও উটের সাত ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ একটি গরু, মহিষ বা উটের সাত শরিকে বা সাতজনের পক্ষ থেকে কুরবানী করা যাবে।

কোরবানি করা কাদের উপর ওয়াজিব

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে রাসুল! আপনি বলুন, আমার নামাজ, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ বিশ্ব জাহানের পালনকর্তা আল্লাহর জন্য উৎসর্গিত। (সূরা : আনআম, আয়াত: ১৬২)
কোরবানিতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শর্তহীন আনুগত্য শিক্ষা রয়েছে। এতে আল্লাহর ভালোবাসায় নিজের সব চাহিদা ও সম্পদ ত্যাগ করার শিক্ষা রয়েছে।

মহান আল্লাহতালা সূরা হজ্বে ইরশাদ করেছেন: “আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানীর বিধান রেখেছি”। (সুরা হজ্ব : আয়াত: ৩৪)। অন্যদিকে সূরা কাওসারে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করো এবং কুরবানী করো”। (সুরা কাউসার, আয়াত ২)

ইসলামে যত বিধান আছে তার অন্যতম বিধান হল কোরবানি। কোরবানি করা অত্যন্ত তাৎপর্যমণ্ডিত ও ফজিলত পূর্ণ এবাদত । এতে আছে আত্মত্যাগের মহিমা ও আর্তদের সেবার গৌরব। আদি পিতা হযরত আদম (আ:)  এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিল থেকে শুরু হওয়া এই কুরবানীর ইতিহাস, মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ:) ও তার শিশুপুত্র ইসমাইল (আ:) এর মহান আত্মবিসর্জনে উজ্জল, যা কেয়ামত পর্যন্ত অম্লান থাকবে।

কোন ব্যক্তির জন্য কোরবানি ওয়াজিব হওয়া কিংবা সুন্নত হওয়ার জন্য কুরবানী কারীকে অবশ্যই ধনী হওয়া শর্ত। অর্থাৎ তার নিজের খরচ পাতি ও সে যাদের খরচ চালায় তাদের খরচ চালানোর অতিরিক্ত তার কাছে কুরবানী করার অর্থ থাকা। অতএব কোনো মুসলমানের যদি মাসিক আয় বা বেতন থেকে খরচ চালানোর পরে অতিরিক্ত হিসেবে তার কাছে কোরবানির পশু কেনার অর্থ থাকে, তাহলে সেই ব্যক্তি কর্তৃক কোরবানি দেওয়ার বিধান রয়েছে।

কাদের ওপর কুরাবানি করা ওয়াজিব

কোরবানি করার জন্য ধনী হওয়ার শর্ত মর্মে দলিল হচ্ছে, নবী সাঃ এর বাণী:  “যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে অথচ সে কুরবানী করেনি, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।”  (সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১২৩, আলবানী ‘সহীহ সুনানে ইবনে মাজাহ’ গ্রন্থে হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।) এখানে সামর্থ্য দ্বারা ধনী হওয়া কে বোঝানো হয়েছে। স্বাভাবিক জ্ঞান সম্পন্ন, প্রাপ্তবয়স্ক কোন মুসলিম যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকেন তবে তাদের পক্ষ থেকে একটি কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব বা অবশ্যক। এখানে নিসাব বলতে বোঝানো হয়েছে, সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে ৫২  ভরি রুপা অথবা এর সমমূল্যের নগদ টাকা,  ব্যবসার পণ্য বা সম্পদ।

কোরবানির পশু যে কোন মুসলিম নারী ও পুরুষ উভয়েই জবাই করতে পারে। তবে যার কোরবানী সে নিজে জবাই করাই উত্তম। কোরবানির দোয়া জানা জরুরী নয় “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলে জবাই করলেই হবে। এছাড়াও অন্য কোন দোয়া জানা থাকলে তা পড়া ভাল। কোরবানীর জন্য কোন উচ্চস্বরে নিয়ত নেই এবং কোরবানি দাতার নাম বলাও জরুরী নয়। যিনি কোরবানি দিচ্ছেন তার মনের ইচ্ছাই নিয়ত হিসেবে কবুল হবে। নিজে জবাই করতে না পারলে যেকোনো কাউকে দিয়ে জবাই করতে পারেন। তবে জবাইয়ের সময় নিজে উপস্থিত থাকতে পারলে ভালো।

কোরবানির গোশত ধনী-গরিব সবাই খেতে পারবে। তবে সুন্নত হল – কিছু অংশ আত্মীয়-স্বজনকে দেওয়া, কিছু অংশ গরিব পাড়া-প্রতিবেশীদের দেওয়া এবং কিছু অংশ নিজের পরিবারের জন্য রাখা। যত বেশি গরিব মিসকিন কে দেওয়া যাবে ততো ভালো। আবার প্রয়োজনে সম্পন্নটা রাখাও যাবে। অনেকেই তিনভাগের একভাগ দিয়ে থাকেন। অনেকে সামান্য রেখে পুরোটাই দিয়ে থাকেন। ত্যাগ এর কুরবানীর গোশত ভোগের জন্য পুঞ্জিভূত করে রাখা অনৈতিক ও অমানবিক।

ওয়াজিব কুরবানী ছাড়াও ছোট-বড়, জীবিত-মৃত যেকোনো কারো পক্ষ থেকে যেকোন কেউ নফল কোরবানি আদায় করতে পারেন । এতে উভয়েই সোয়াবের অধিকারী হবেন। নারী যদি সামর্থ্যবান বা নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে থাকেন তবে তার পক্ষে কোরবানি ওয়াজিব। শিশুদের ওপর কোরবানির সহ কোন ফরজ, ওয়াজিব  প্রযোজ্য নয়। হিজড়ারা মূলত নারী বা পুরুষ। তাই তারাও প্রাপ্তবয়স্ক এবং সামর্থ্যবান হলে নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত এর মত কোরবানি ওয়াজিব হবে। কোরবানি ও আকিকা একসঙ্গে করতে কোন বাধা নেই। কুরবানীর পাশাপাশি অভাবী, গরিব-দুঃখী, দুর্দশাগ্রস্ত মানুষকে  ঈদ আনন্দে শামিল করার জন্য বেশি বেশি আর্থিক দান বা অনুদান, জামাকাপড় প্রদান এবং নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে দেয়ার মাধ্যমে আরও বেশি পূণ্য অর্জন করা যায়।

কেউ যদি কোরবানি করতে না পারে তাহলে করনীয়:

কেউ যদি কোরবানির দিনগুলোতে ওয়াজিব হওয়ার কুরবানী দিতে না পারে, তাহলে কুরবানীর পশু ক্রয় না করে থাকলে  তার ওপর কুরবানীর উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button